অভিভাবকের করণীয়

আদর্শ অভিভাবকেই গঠন হয় সফল শিক্ষার্থী....

একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সাধারণত মা-বাবার কাছে থাকে। মা-বাবাই তার প্রথম পাঠশালা। তাই সন্তান আদর্শ ও সৎ হওয়ার পেছনে মা-বাবার ভূমিকাই বেশি। সন্তান দুনিয়াতে কত বড় হবে, কতটা ভালো মানুষ হবে, কতটুকু সফল হবে-তা অনেকটাই নির্ভর করে মা-বাবার উপর। মা-বাবাকে প্রথমেই তার সন্তানের ব্যাপারে টার্গেট ঠিক করতে হবে যে, আমাদের সন্তানকে আমরা কি বানাতে চাই। যেমন, ধরুন আমাদের সন্তানকে আমরা ভালো হাফেয, মাওলানা ও মুত্তাকী-আল্লাহওয়ালা বানাতে চাই। এখন সেই টার্গেটকে সফলভাবে পূরণ করার লক্ষ্যে মা-বাবাকে শুরু থেকেই প্লান ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে যাতে সন্তানকে সহজে সেই সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌছানো যায়। মা-বাবার সেই প্লান ও উদ্যোগকে কিছুটা সহজ করার লক্ষ্যে নিম্নে আমরা কিছু পরামর্শ তুলে ধরলাম।

১. সন্তানের জন্য দুআ করা....

মা-বাবার দুআ হলো সন্তানের সাফল্যের ভিত্তি। যত বড় বড় মনীষীগণ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের সাফল্যের ভিত্তি কী ছিল? লক্ষ করলে দেখা যায়- ক. আল্লাহ তাআলা তাদের ভালো মাদরাসা দান করেছিলেন। খ. স্নেহশীল আদর্শ শিক্ষক মিলিয়ে দিয়েছিলেন। গ. খুব দরদী মাশায়েখ নসিব করেছিলেন। কিন্তু এ সবকিছুর নেপথ্যে রুহ হিসাবে কাজ করেছিল মা-বাবার দুআ। কেননা মা-বাবার দুআ হলো সমস্ত সাফল্যের ভিত্তি বা বুনিয়াদ। সন্তানের জন্য নিজের মন প্রসারিত করে বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করে দুআ করা উচিত। যদি আপনার দুআ কবুল হয়ে যায় (ইনশা-আল্লাহ দুআ কবুল হবেই হবে), তাহলে আপনার খবরই থাকবে না যে, আপনার আদরের সন্তানের ফয়েজ (কল্যাণের ধারা) দ্বারা আল্লাহ তাআলা কত মানুষের উপকার করবেন। তার উসিলায় কত মানুষ জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে! আপনার মর্যাদার আসন কত উন্নত হবে! এজন্যেই জন্মের আগেই সন্তানের জন্য দুআ শুরু করে দেয়া। সন্তানের জন্য দুআ করে তাদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যেন তারা আমাদের পার্থিব জীবনের শোভা ও পরকালের পাথেয় হয়। এখন প্রশ্ন হতে পারে সন্তানের জন্য কিভাবে কী দুআ করবো? এখানে উদাহরণ স্বরূপ কিছু দুআ উল্লেখ করা হলো।

১. নেককার সন্তানের জন্য এই দুআ করা…
* হে আমাদের রব, আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। [সুরা ফুরকান-৭৪]
* হে আমার রব, আমাকে নেককার সন্তান দান করুন। [সুরা সাফফাত-১০০]
২. দ্বীনের প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য এই দুআ করা…
* হে আমার রব, আমাকে নামায আদায়কারী বানিয়ে দিন এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমার রব, আমার দুআ কবুল করুন। [সুরা ইবরাহিম-৪০]
৩. নিরাপদ বাসস্থান ও গোনাহ থেকে বাচার জন্য এই দুআ করা…
* হে আমার রব, এ নগরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার ছেলেদের প্রতিমাপূজা থেকে দূরে রাখুন। [সুরা ইবরাহিম-৩৫]
এমনিভাবে সন্তানের কল্যাণ, আদব-আখলাক, বিনয়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, দ্বীনি শিক্ষা, সৎসঙ্গ, ভালো মাদরাসা, আদর্শ শিক্ষক, সুচিন্তা-ভাবনা, সুস্বাস্থ্য, আমল, শয়তান ও মানুষের অনিষ্ট থেকে হেফাযত, কু-দৃষ্টি, উভয় জগতের সাফল্য ইত্যাদি বিষয়ে নিজের ভাষায় বিনীতভাবে রোনাজারি করে আল্লাহ তাআলার কাছে সবসময় দুআ করতে থাকা। আর দুআর ব্যাপারে হতাশ না হওয়া এবং তাড়াহুড়া না করা। আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণাঙ্গ আশা রাখা যে, আল্লাহ আমার দুআ কবুল করবেন ইনশা-আল্লাহ।

২. মা-বাবার উপার্জন ও খাদ্য হালাল হওয়া....

হালাল উপার্জন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি এতে তার মন- মানসিকতা ও চরিত্র উন্নত হয়। সে হয় কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্বশীল। তার অন্তর হয় উদার এবং বাহ্যিক আচার-আচরণ হয় মার্জিত ও প্রশংসিত। তার মন হয়ে ওঠে হিতাকাঙ্খী ও পরোপকারী। এর বিপরীতে যে ব্যক্তি অবৈধ পথে উপার্জন করে, তার স্বাস্থ্য, মন-মানসিকতা ও চরিত্র সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। হালাল উপার্জনকারী ব্যক্তির উন্নত ও প্রশংসনীয় চরিত্রের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হয়। এজন্য ব্যক্তি পরিবার ও সমাজের জন্য হালাল উপার্জন যেমন উপকারী ও কল্যাণকর, তেমনি দুআ, ইবাদত-বন্দেগী কবুলের জন্যও হালাল উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে দেহের গোশত হারাম উপার্জনে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম সম্পদে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামই সমীচীন। [শারহুস সুন্নাহ লিল বাগাবি-২০২৯]

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হারাম খাবার দ্বারা প্রতিপালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [মুসনাদু আবি ইয়ালা-৮৩]

সম্মানিত অভিভাবক, আপনার সন্তানকে আমলী হাফেয ও আলেম বানাতে চাইলে জরুরী হলো আপনার উপার্জন হালাল করা। একটু চিন্তা করে দেখুন, উপার্জন বা রিজিক হালাল না হলে আপনার দুআ কবুল হবে না। ফলে আপনার সন্তানও দ্বীনের প্রকৃত আলেম হবে না।

৩. ঘর থেকেই শিক্ষা শুরু করুন....

শিশুদের প্রথম শিক্ষাটা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। কেননা একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সাধারণত মা-বাবার কাছে থাকে মা-বাবাই তার প্রথম পাঠশালা। এখানে সে জীবনে অনেক কিছু শেখে। পরবর্তী সময়ে এটাই তার অভ্যাসে পরিণত হয়। ইসলাম এই শিক্ষার অনেক গুরুত্ব দেয়। মা-বাবার এই শিক্ষা সন্তানের জীবনে কতটুকু কার্যকর, তা আমরা জানতে পারি হাদিসে নববী থেকে। হযরত আবু হুরায়রা রযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতিটি সন্তান ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান বা মুশরিক (অগ্নিপূজক) বানায়। [সহিহ বুখারী-১৩৮৫]

এজন্যই শরীয়তে ইসলামের আদেশ হলোঃ 

এক. ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্রই শিশুর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া, যেন তার জীবন শুরু হয় আল্লাহর সুমহান বাণী “আল্লাহু আকবার” দিয়ে।

দুই. সন্তানের অর্থবোধক সুন্দর নাম রাখা ও আকিকা করা। এবং কোনো নেককার আল্লাহওয়ালার মাধ্যমে তাহনিক করানো।

তিন. কথা বলা শুরু করলে তাকে প্রথমে আল্লাহর নাম শেখানোর চেষ্টা করা। কারণ তিনিই এই সন্তান আমাদের দান করেছেন। বাকশক্তি দিয়েছেন। তাই প্রথমে আল্লাহর নাম শেখানোই কৃতজ্ঞ বান্দার পরিচয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সন্তানকে প্রথম কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শেখাও এবং মৃত্যুর সময় তাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর’ তালকিন করো। [শুআবুল ঈমান-৮২৮২]

চার. শিশুকাল থেকেই অল্প অল্প করে আল্লাহর পরিচয় শেখানো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয় শেখানো। গল্পে গল্পে তাঁর সুন্নাত ও আখলাক তুলে ধরা মা-বাবার কর্তব্য। এক কথায় তার জীবনের প্রথম মাদরাসা (ঘর) থেকেই যেন সে সঠিক ও উপকারী শিক্ষা অর্জন করতে পারে, আমাদের সেই ব্যবস্থা করা উচিত। এজন্য প্রথমে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।সন্তানকে সুশিক্ষা দেওয়া হল কি না সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে হিসাব দিতে হবে।

পাঁচ. শিশুর খাদ্যঅভ্যাস তৈরীতেও লক্ষ্য রাখা। শুধু মুখের মজা এমন খাবার না দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহনে অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষ করে যে সকল খাবার শিশুর মেধা বাড়াতে সাহায্য করে, যেমন- ডিম, দুধ, মাছ (বিশেষ করে ছোট মাছ ও সামুদ্রিক মাছ), সবুজ শাকসবজি, বাদাম ও বীজ, ফল, কলা, ডাল ও দই ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় যোগ করা। এই খাবারগুলোতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে এ ব্যাপারে কোনো কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিলে আরো বেশি ফায়দা হবে বলে আশা রাখি।

ছয়. শিশুদের প্রথম পাঁচ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রাহ. বলেন বাচ্চাদের স্বভাব-চরিত্র যা গড়ার, তা পাঁচ বছর বয়সেই হয়ে যায়। এরপর ভালো-মন্দ যেটাই হয়, তা মজবুত ও পাকাপোক্ত হতে থাকে, যা পরে সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং বাচ্চা বুঝুক আর না-ই বুঝুক, ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখাতে হবে। এক সময় সে বুঝবে এবং উত্তম চরিত্র নিয়ে বড় হবে। কাজেই এমনটা মনে না করা যে, এখন ছোট সে বুঝবে না, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে, বড় হলে এমনিতেই বুঝে যাবে, এমন ধারনা ভুল। বরং শিশুকাল থেকেই বাচ্চাদের স্বভাব-চরিত্র সুন্দর করার লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।

৪. স্বাধীনতার নামে সন্তানকে ছেড়ে দেবেন না....

বর্তমানে সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার নামে একটা অশুভ আন্দোলন শুরু হয়েছে। দুনিয়ার যত স্বাধীনতা আছে, তার সবটুকু এখন কোমলমতি সন্তানের মধ্যে এসে জমা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা অশুভ পাঁয়তারা। একেবারেই অগ্রহণযোগ্য একটা দাবি। সন্তানের আখলাক-চরিত্র গড়ার স্বার্থে তাকে ছাড়া করা যাবে না। কারণ, তাকে ছেড়ে দিলে সে মন্দ পরিবেশের সাথে মিশে ধীরে ধীরে নানা ধরনের মন্দ প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। পরবর্তী সময়ে সে মা-বাবার কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সময়মতো শাসন না করার কারণে বড় হয়ে মা-বাবারই অবাধ্য হয়ে যাবে। তাই সন্তানকে লাগামহীন স্বাধীনতা দেওয়া উচিত নয়। সন্তানের আখলাক-চরিত্র গড়ার দায়িত্ব মা-বাবারই। সময়মতো তাকে শাসন করা, মন্দকাজ থেকে বিরত রাখা, সৎ ও দ্বীনি পরিবেশে রাখা মা-বাবার নৈতিক দায়িত্ব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও, ১০ বছর বয়সে নামাযের জন্য শাসন করো এবং এই বয়সে তাদের বিছানা পৃথক করে দাও। [মুসনাদু আহমাদ-৬৭৫৬] এই হাদিস আমাদের নির্দেশ দেয় যে, সন্তানকে একেবারে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না; বরং বুঝের বয়স হওয়া থেকেই তাকে পরিমিত শাসনের মধ্যে রাখতে হবে। অন্য হাদিসে ঘরে লাঠি ঝুলিয়ে রাখার কথাও পাওয়া যায়। সন্তানকে আচার-ব্যবহার শেখানোর জন্য যদি প্রয়োজনীয় শাসন করা না হয়, তবে ছোটরা শিখবে কীভাবে? অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা অভিযোগ করেন বাচ্চা এখনো ছোট, সে শাসনের কিছু বুঝবে না; সে যা করছে করুক, বড় হলে তা সংশোধন করা যাবে। এমন মনোভাব কাম্য নয়। শুধু শিশুকালেই নয়, পরিণত বয়সে উপনীত হওয়ার পরও সন্তানকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সার্বিক দেখভাল করতে হবে। সময়মতো তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করাও মা-বাবার দায়িত্ব, যেন তারা কোনো পাপাচারে লিপ্ত না হয়। অভিভাবকের শিথিলতার কারণে সন্তান যদি কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এর জন্য তারা দায়ী হবেন। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার অজুহাতে সন্তানকে লাগামহীন অবাধে ছেড়ে দেওয়া তাকে ধ্বংস করার নামান্তর। বিশেষ করে নিম্নোক্ত বিষয়ে উদারতা প্রদর্শন করা সন্তানের নিশ্চিত ধ্বংসের কারণ :

এক. অসৎসঙ্গ/বন্ধু অবলম্বনে বাধা না দেওয়া।  সহপাঠী হোক কিংবা প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের মধ্যে দুশ্চরিত্র ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া। যখন যেভাবে ইচ্ছা তাদের মিশতে দেওয়া। এতে তাদের খারাপ চরিত্র অতি দ্রুত আপনার সন্তানের মধ্যে চলে আসার এবং সে-ও একসময় তাদেরমতো বা তাদের চেয়ে আরও খারাপ হয়ে যাওয়ার খুবই সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সন্তান যেন কোনো অসৎসঙ্গ/বন্ধু গ্রহন করে না নেয়। কারণ মানুষের স্বভাব-চরিত্রে, অভ্যাস ও জীবনযাপনে তার বন্ধুর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। একজন ভালো বন্ধু জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর একজন অসৎবন্ধু জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এজন্যেই আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে সত্যবাদীদের সঙ্গ লাভ করতে বলেছেন। এর রহস্য হলো সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকলে সত্যবাদী হওয়া যায় আর মিথ্যাবাদীদের সঙ্গে থাকলে মিথ্যাবাদী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা কুরআন-হাদিস, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত এক বাস্তব কথা। হযরত আবু হুরায়রা রযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ তার বন্ধুর দিনের উপর হয়, অতএব তোমাদের প্রত্যেককে দেখা উচিত কাকে বন্ধু বানাবে। [সুনানে আবু দাউদ-৪৮৩৩] সুতরাং নিজের সন্তানকে সু-নাগরিক, আদর্শবান ও আল্লাহওয়ালা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবশ্যই অবশ্যই অসৎসঙ্গ/বন্ধু পরিহার করতে হবে এবং সৎসঙ্গ/বন্ধু গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রথম থেকেই শিশুকে একটি ভালো পরিবেশে রাখা উচিত। 

দুই. অশ্লীল ছবি, নাটক, ভিডিও, সিনেমা ও নাচগান ইত্যাদি দেখতে বাধা না দেওয়া। এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়াও ধ্বংসাত্মক। এতে সন্তান পড়ালেখার পরিবেশ থেকে দূরে সরে যায় এবং তার স্বভাব-চরিত্রে অশ্লীলতা প্রবেশ করতে থাকে। যা ইলমের জন্য বড়ই প্রতিবন্ধক। কাজেই সন্তান যেন কোনোভাবেই উল্লেখিত বিষয়গুলো দেখতে না পারে, এ ব্যাপারে মা-বাবাকে সজাগদৃষ্টি রাখতে হবে। যে সকল স্থানে বা পরিবেশে গেলে তা দেখার সম্ভাবনা থাকে, সে সকল স্থান বা পরিবেশ ত্যাগ করতে হবে।

তিন. মোবাইল ও ভিডিও গেমসের ব্যাপারে সতর্ক না হওয়া। অনেক মা-বাবাই সন্তানের ভালোবাসায়, আবার অনেকে সন্তানকে শান্ত রাখার জন্য হাতে মোবাইল দিয়ে রাখে। অথচ এই মোবাইল সন্তানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর ফলে চোখের ক্ষতি, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এবং উদ্বেগ-বিষণ্যতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সন্তানের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যাওয়া, ভাষার দক্ষতা দেরিতে বৃদ্ধি পাওয়া এবং সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলোও দেখা দিতে পারে। কাজেই মা-বাবাকে সন্তানের হাতে মোবাইল দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

চার. পর্দার বিষয়ে ছাড় দেওয়াও ধ্বংসাত্মক। ঘরে-বাইরে সর্বত্র শরঈ পর্দা রক্ষা করা ফরয। পর্দাহীনতার কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে গুনাহ ব্যাপক হচ্ছে। সন্তানের চরিত্র ধ্বংস হওয়ার এটা একটা বড় কারণ। মাহারাম নয় এমন মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের মিশতে দেওয়া এবং মেয়েদের ঘরের বাইরে একাকী যাওয়ার অনুমতি দেওয়া। এ ব্যাপারে তাদের স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়াও ভীষণ ক্ষতিকর। সময় থাকতেই মা-বাবা সচেতন ও সাবধান হোন। না হয় এমন বিপদে পড়বেন যে, সেখান থেকে মুক্তির আর কোনো উপায় থাকবে না। 

৫. একটি দ্বীনি মাদরাসা নির্বাচন করা....

এক. শিশুর পাঁচ বছর হয়ে গেলে তাকে কুরআনে কারীম শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে মা-বাবাকে উদ্যোগ নিতে হবে। সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত ও আদর্শ সন্তান হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে, মা-বাবাকে অবশ্যই একটি আদর্শ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান/মাদরাসা নির্বাচন করতে হবে। যাতে ৭ বছর বয়সেই আমার সন্তান নিয়মতান্ত্রিকভাবে কুরআনে কারীম নাযিরা পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রাহ. বলেন যে, নামাযের জন্য যখন হাদীসে সাত বছর বয়স কে নির্ধারণ করা হয়েছে, এর থেকে আমার মনে হয় নিয়মতান্ত্রিক লেখাপড়া শুরু করার উপযুক্ত সময় সাত বছর।

দুই. নিজ সন্তানের জন্য যে মাদরাসা নির্বাচন করতে চাচ্ছেন, শুরুতে সে মাদরাসার হাল-হাকীকত ভালো করে জেনে নেয়া। এবং নিজ সন্তানকে হাফেয, আলেম ও আল্লাহওয়ালা বানানোর জন্য মা-বাবা যে প্লান/টার্গেট করেছেন, তা মাদরাসার শিক্ষক/কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করবেন। মা-বাবার পেশকৃত প্লান/টার্গেট বাস্তবায়নে মাদরাসার প্লান/টার্গেট কী? সেটা জেনে মনঃপূত হলে, উক্ত মাদরাসাকে নিজের সন্তানের জন্য নির্বাচন করে নেওয়া।

তিন. নির্বাচিত মাদরাসার (বাস্তবমুখী) ভালো দিকগুলো, তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং মাদরাসার শিক্ষকদের ভালো গুণাবলি ও শ্রেষ্ঠত্ব সন্তানের সামনে বেশি বেশি মুযাকারা করা, সম্ভব হলে মাঝে মধ্যে মাদরাসা দেখাতে নিয়ে যাওয়া, শিক্ষকদের সাথে সাক্ষাত করানো। এতে সেই মাদরাসা ও শিক্ষকদের প্রতি সন্তানের দিলে মুহাব্বত, আযমত ও সম্মান বৃদ্ধি পেতে থাকবে। মাদরাসায় ভর্তির ব্যাপারে তার আগ্রহ বাড়তে থাকবে। ফলে ভর্তির সময় তাকে জোরাজুরি করতে হবে না। মাদরাসা ও মাদরাসার শিক্ষকদের পরিচিত মনে হবে। মানসিকভাবে সে প্রস্তুত থাকতে পারবে।

চার. মাদরাসার ভর্তির নিয়মাবলী ভালোভাবে জেনে সন্তানসহ সময়মত মাদরাসায় উপস্থিত হয়ে, নিজ সন্তানকে মাদরাসার নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি করিয়ে দেওয়া। ভর্তির সময় মাদরাসার আইন-কানুন ভালোভাবে জেনে তার প্রতি নিজেও শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সন্তানের অবস্থা অনুযায়ী তাকেও আইন-কানুনের গুরুত্ব বুঝানো। ভর্তির সময়ই নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা। নিয়তের আলোচনা পরবর্তীতে আসছে।

পাঁচ. উদ্বোধনী ক্লাসে সন্তানের সাথে নিজেও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করা। কখন যেন সন্তান ক্লাসে অনুপস্থিত না থাকে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। ছুটির প্রয়োজন হলে মাদরাসার নিয়মানুযায়ী ছুটি গ্রহন করা। ছুটি ছাড়া ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা এটা অন্যায় নিজেও বুঝা, সন্তানকেও বুঝানো।

ছয়. নিজ সন্তানকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌছানোর লক্ষ্যে বাবাকে শিক্ষকের সাথে জোটবদ্ধ হতে হবে। সন্তানকে প্লান/টার্গেট মোতাবেক পরিচালনার জন্য বাবা ও শিক্ষককে একসাথে কাজ করতে হবে। একে অপরকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করতে হবে। সন্তানের পড়ালেখা, আমল ও তরবিয়াতের বিষয়ে মা-বাবাকে শিক্ষকের সাথে পরামর্শ করতে হবে। অনেক মা-বাবা শুধু সন্তানের কথা শুনে তার পড়ালেখা ও মাদরাসার কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে ফেলেন, এ ব্যাপারে শিক্ষকের কোনো কথা/পরামর্শ নেওয়া হয় না। সন্তানের জন্য এ বিষয়টা ভয়ংকর ক্ষতির কারণ। সন্তানের ভালোর জন্য মা-বাবাকে শিক্ষকের সাথে জোটবদ্ধ হতে হবে, সন্তানের সাথে নয়।

সাত. ৭/৮ বছর বয়সে পূর্ণ কুরআনে কারীম নাযিরা পড়তে পারা। ১১/১২ বছর বয়সে হিফয শেষ করা। ২৩/২৪ বছর বয়সে পূর্ণ আলেম হওয়া। এরপর গবেষণামূলক পড়ালেখা করা। তাই টার্গেট ঠিকমত পূরণ করার লক্ষ্যে সন্তানের পড়ালেখা, আমল ও তরবিয়তের ব্যাপারে প্রতিনিয়ত খোজ-খবর রাখা। তথ্যবই/রিপোর্ট দেখা, উন্নতি/অবনতির বিষয়ে শিক্ষকের সাথে আলোচনা পর্যালোচনা করা। মনে রাখবেন মা-বাবা ও শিক্ষকের কোনো অসতর্কতা মূলক সিদ্ধান্তের কারনে, সন্তানের ভবিষ্যত যেন নষ্ট না হয়ে যায়। এ সময় মা-বাবা কোনো ভুল/অবহেলা করলে, পরবর্তীতে তওবা করলেও সে ক্ষতি আর পূরণ হবে না।

৬. মা-বাবার নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা....

অনেক মা-বাবা নিজের সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন, কিন্তু মাদরাসায় কেন ভর্তি করিয়েছেন, তার নিয়ত/উদ্দেশ্য ঠিক করেন নি, অনেকে আবার জানেনও না, আমাদের আদরের সন্তানকে কেন মাদরাসায় পাঠালাম, শুধু অন্যদের দেখাদেখি সন্তানকে মাদরাসায় পাঠিয়েছি? না কোনো আলেমের সম্মান ও নামযশে প্রভাবিত হয়ে এ কাজ করেছি যে, নিজের সন্তানের জন্যও এমন খ্যাতি কুড়ানোর বসনায় তাকে মাদরাসায় ভর্তি করেছি? অথবা সে ছিল একটি অকর্মণ্য, তার প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফল ভালো ছিল না, তাই চিন্তাভাবনা করে তাকে মাদরাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। না এ কারণে যে, সে ঘরে খুব জ্বালাতন করত। বাইরের নষ্ট পরিবেশের সাথে মিশে তার প্রভাবে স্বভাব বিগড়ে গিয়েছিল। সুতরাং চিন্তাভাবনা করে দেখা গেল যে, এই দুশ্চিন্তাকে ঘরে রাখার পরিবর্তে মাদরাসায় পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো। সাবধান, আমাদের সন্তানকে মাদরাসায় পাঠানোর নিয়ত এমনটি যেন না হয়। সন্তানকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌছনোর লক্ষ্যে, আজই নিয়তকে পরিশুদ্ধ করুন। কীভাবে নিয়ত করবেন?। সন্তানকে মাদরাসায় পাঠানোর লক্ষ্য কীভাবে ঠিক করবেন?। এভাবে করুন। সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করার লক্ষ্য/উদ্দেশ্য হলো : 

এক. আমার সন্তান যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়ারিস হতে পারে। নবীগণ কোনো ধনসম্পদ, টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ির ওয়ারিস রেখে যান নি। বরং নবীগণ ইলমে দ্বীনের ওয়ারিস রেখে গিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আলেমগণ হলেন নবীদের ওয়ারিস। আর নবীরা দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহামের (রৌপ্যমুদ্রা অর্থাৎ টাকা-পয়সা, ধনসম্পদ) ওয়ারিস রেখে যাননি; বরং তাঁরা ইলমের ওয়ারিস রেখে গেছেন। সুতরাং যারা ইলম অর্জন করলো, তাঁরা  যেন তার সমৃদ্ধ (বিশাল) একটি অংশ পেয়ে গেল। [সুনানুত তিরমিজী-২৬৮২] 

দুই. সন্তান যেন আলিমে হাক্কানী-রব্বানী, আল্লাহওয়ালা হতে পারে। আলেমে হক্কানী ও রব্বানী হলেন সেই আলেম, যিনি শুধু আক্ষরিক জ্ঞানই অর্জন করেন না, বরং সেই আক্ষরিক জ্ঞানের পাশাপাশি ইলমে নবুওয়াত ও নুরে নবুওয়াত অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও তাঁর মারেফাত লাভ করেন এবং আল্লাহভীরু বা মুত্তাকী হন। সেই ইলমের নুর ও আলো দ্বারা সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করার ফিকির নিয়ে সদা কাজ করেন। মানুষকে দ্বীনে ইসলামের প্রতি আহবান করেন। 

তিন. সন্তান যেন একজন বা-আমল ফকিহ হতে পারে। ফকিহ হলেন এমন একজন ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ যিনি ফিকহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে শরীয়তের বিধান বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারদর্শী। তিনি ইসলামী আইনের প্রয়োগ ও নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হন এবং এ বিষয়ে অন্যদের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এমন একজন ফকিহ শয়তানের কাছে এক হাজার আবেদের চেয়েও ভারি।

চার. সন্তান যেন ইলমে দ্বীন অর্জন করে দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদেম হতে পারে। এমনিভাবে ইলম অর্জনের মাধ্যমে আমাদের সন্তানের দুনিয়া-আখিরাত যেন উজ্জল হয়। তার মাধ্যমে আমাদের ও আমাদের বংশের যেন দুনিয়া-আখিরাত সুন্দর ও আলোকময় হয়। আমাদের সন্তান শতকোটি মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এক বিশাল মাধ্যম যেন হয়। এই নিয়তও করা।

পাঁচ. সন্তান আলিম হয়ে কী খাবে? সেতো সরকারী চাকরী পাবে না, এসব চিন্তা মনে আনবেন না। এমনিভাবে ইলম অর্জনের মাধ্যমে আমাদের সন্তানের দুনিয়া-আখিরাত যেন উজ্জল হয়। তার

৭. মা-বাবার প্রবল আগ্রহ থাকা....

সন্তানকে হাফেয, আলিমে হক্কানী-রব্বানী ও আল্লাহওয়ালা বানাবার জন্য মা-বাবার প্রবল আগ্রহ/ইচ্ছা ও জযবা থাকতে হবে। কোনো রকম বা একটু চেষ্টা করে দেখি, এমনটা নয়। বরং পূর্ণাঙ্গ চেষ্টার পাশাপাশি দিলে প্রবল আগ্রহ রাখা যে, আমার সন্তান হাফেয, আলিমে হক্কানী-রব্বানী ও আল্লাহওয়ালা হবে। ইনশা-আল্লাহ। কোনো আলিমে হক্কানী বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সন্তানের কল্যাণে যে পরামর্শ দিবেন, সে পরামর্শ যথাযথভাবে পালন করা। এক্ষেত্রে নিজের মনের ইচ্ছাকেও বিসর্জন দেওয়া।

৮. আদর্শ অভিভাবকের কিছু গুণাবলী....

স্বাভাবিকভাবে সকল মা-বাবাই সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন; কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততা, সাংসারিক নানান চিন্তার বেড়াজালে অভিভাবকরা এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েন যে, সন্তানের প্রতি আলাদা করে মনোযোগ দেওয়ার সময় পান না। এভাবে সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। কখনো কখনো ভুল পথে পা বাড়ায় আপনার-আমার আদরের সন্তান। আমাদের জীবনে পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিয়ামত। এজন্য সন্তানকে পর্যাপ্ত আদর-ভালোবাসা দিয়ে লালন-পালনের পাশাপাশি অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো:

১. তাদের যথাযথ মূল্যবোধ শেখানো।

২. ভালো-মন্দের পার্থক্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করা।

৩. সত্যকে গ্রহণ করা এবং মিথ্যাকে ত্যাগ করার অভ্যাস করানো।

৪. সত্যবাদী ব্যক্তিদের সঙ্গে মিশতে অভ্যস্ত করানো।

মনে রাখতে হবে, আপনার ঘর ও পরিবারের পরিবেশ আপনার সন্তানকে অনেক বেশি আশাবাদী, আত্মবিশ্বাসী এবং ভবিষ্যতের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এজন্য ঘরকে সুন্দর করতে হবে। পরিবেশকে আপনার সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক বানাতে হবে। আপনার ঘরকে কিভাবে সুন্দর ও সহায়ক বানাবেন, সেটা স্থান-কাল অনুযায়ী আপনি সিদ্ধান্ত নিবেন। তবে এখানে আমরা কিছু বিষয় উল্লেখ করছি, যেগুলো আদর্শ অভিভাবকের জন্য অনেক উপকারী হবে বলে মনে করি।

এক. সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করুন। আপনার সন্তান আপনার কাছে ভালোবাসা পেতে চায়, আপনি সাধ্যমতো ভালোবাসা দিন এবং তা প্রকাশ করুন। কারণ, ভালোবাসা জীবন থেকে সব ধরনের গ্লানি, বিষন্নতা দূর করতে সক্ষম। তাই একটা উষ্ণ আলিঙ্গন অথবা মাথার উপর দুআর হাত তার জীবন থেকে সকল কষ্ট, গ্লানি মুহূর্তে মুছে ফেলতে সক্ষম।

দুই. সন্তানের প্রশংসা করুন। প্রতিটি মানুষই নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। বিশেষ করে সন্তান সবসময় মা-বাবার কাছ থেকে তার প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। এটি তাকে ভালোকাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। তাই তার সাফল্যে অবশ্যই তার প্রশংসা করুন। এমনকি যদি সে কোন কাজে সফল না-ও হয়, তারপরও তাকে অনুপ্রাণিত করে এমন কিছু বলুন। যেমন: তুমি এবার পারোনি, সামনে ভালো করবে, ইনশা-আল্লাহ। এবার পারোনি তো কি হয়েছে, তুমি আমাদের কাছে সবসময় বিজয়ী। এগুলো সন্তানের মনে ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি করবে।

তিন. তুলনা কিংবা পক্ষপাত থেকে দূরে থাকুন। প্রতিটি সন্তানেরই নিজস্ব স্বকীয়তা আছে। সুতরাং তাকে তার নিজের মতো বিকশিত হতে দিন। এ জন্য অন্যের সন্তানের সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা থেকে বিরত থাকুন। তুলনা অনেক সময় শিশুদের মানসিকতা ধ্বংস করে দেয়। কখনো কখনো তাকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। এমনকি নিজের সন্তানদের মধ্যেও তুলনা অথবা পক্ষপাত করা উচিত নয়। এতে ভাই-বোনের সম্পর্কেও ছেদ দেখা দেয়।

চার. সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনার সন্তান আপনাকে কী বলতে চায়, তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং তার কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। শোনার পর আপনার মতামত দিন যে, কাজটি তার জন্য উপযোগী নাকি ক্ষতিকর। ক্ষতিকর হলে বুঝিয়ে বলুন। যদি বুঝতে না চায়, তাহলে যার কথা সে বেশি শুনে, তাকে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন।

পাঁচ. তাদের পাশে থাকুন। ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায় তাদের পাশে থাকুন। তাদের বিশেষ দিন যেমন: পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের দিন সামর্থ্যানুযায়ী উদযাপন করুন। আবার পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ করলে সান্ত্বনা দিন। নবী-রাসূলগণ যেভাবে ধারাবাহিক চেষ্টা করে গেছেন, সাহাবীদের কষ্টের বিভিন্ন ঘটনা তাদের শোনান।

ছয়. তাদের সহযোগিতা করুন ও তাদের থেকে সহযোগিতা নিন। তাদের কাজে সহযোগিতা করুন। যেমন: হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করুন। পড়ালেখার বিভিন্ন কাজে সাহায্য করুন। কাপড় ও পড়ার টেবিল গোছাতে সাহায্য করুন। দেখবেন, সে-ও আপনার কাজে সাহায্য করছে। মোটকথা, প্রথমে তাকে সহযোগিতা করুন, পরে সে-ই আপনার প্রতিটি কাজে সহযোগিতা করবে। এভাবে আন্তরিকতা বাড়বে।

সাত. নিয়মিত খোঁজখবর রাখুন। মাঝেমধ্যে মাদরাসায়/স্কুলে গিয়ে শিক্ষক/শিক্ষিকার কাছ থেকে তাদের পড়াশোনাসহ অন্যান্য বিষয়ের খোঁজখবর নিন। এমনকি কখনো কখনো তার বন্ধুদের কাছ থেকেও খোঁজখবর নিতে পারেন। এতে আপনার সন্তান বুঝতে পারবে যে, তার মা-বাবা তার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন।

আট. সন্তানকে আদরের পাশাপাশি শাসনও করুন। আপনার সন্তানের জন্য নির্দিষ্ট সীমানা তৈরি করে দিন। জীবনের ভালো-মন্দ দিকগুলো সম্পর্কে তাকে অবহিত করুন। অন্যায় করলে তা বুঝিয়ে বলুন। প্রয়োজনে শাসন করুন। অবশ্য শাসন করা মানে শুধুই গায়ে হাত তোলা নয়। এটা আপনি পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচনা করবেন।

নয়. সঙ্গী/বন্ধু ঠিক করে দিন। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সত্যবাদী মানুষের সাহচর্য অবলম্বন করতে বলেছেন। এ জন্য আপনার অবুঝ বা কম বুঝের সন্তানের জন্য বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করুন। নাহলে সে ভুল করে বসতে পারে। আর অসৎসঙ্গ/বন্ধু প্রথমে তাকে, এরপর আপনার পরিবারসহ একটি সমাজকে ধ্বংস করবে।

দশ. বয়ঃসন্ধিকালকে বিশেষ গুরুত্ব দিন। বয়ঃসন্ধিকাল আপনার সন্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টাই তার জীবনের গতি নির্ধারণ করে দেয়। এ জন্য এ সময় মা-বাবাকে খুবই সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান না বুঝে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। তাই আপনার সন্তানকে স্বাধীনতার নামে লাগামহীন ছেড়ে দেবেন না। তার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি করে দিন।

এগার. পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করুন। সন্তান সবসময় মা-বাবাকে হাসি-খুশি ও একত্রে দেখতে চায়। তাই সন্তানের সামনে মা-বাবার বন্ধন মজবুত হওয়া জরুরী। এগুলো সন্তানের উন্নত মানসিকতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতের অমিল থাকতেই পারে, মতবিরোধ হতেই পারে; কিন্তু সেটা সন্তানের সামনে প্রকাশ করবেন না। সন্তানের উপস্থিতিতে দুজনের হাসিমুখ সন্তানের সারাদিনের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

বার. একে আপরের প্রতি শ্রদ্ধবোধ তৈরী করুন। সন্তান সবসময় মা-বাবার প্রতি কোমল হৃদয় ধারণ করে। বিনম্র শ্রদ্ধায় ভরে থাকে তার অন্তর। এ জন্য স্বামী-স্ত্রী সন্তানকে একজন অপরজনের ব্যাপারে ভালোকথা বলবেন। যদি আপনি সিঙ্গেল মা কিংবা বাবা হন, তবুও সন্তানকে তার মা-বাবা সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলবেন না। নাহলে সন্তানের মনে মা-বাবার সুন্দর প্রতিচ্ছবি নষ্ট হতে পারে।

তের. আদব-কায়দা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিন। বয়ঃসন্ধিকালে অনেক সময় সন্তান ভুল করে থাকে। কারও সঙ্গে অভদ্রতা করে থাকলে মা-বাবা হিসেবে আপনার উচিত তার সেই অন্যায়ের বিচার করা। তাদের অন্যায়গুলো তাদের সামনে তুলে ধরা। অবশ্য জনসম্মুখে তারা কোনো মন্দ-কাজ করে ফেললে সেখানেই তাকে বকুনি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বাসায় গিয়ে নিজের মতো করে তাকে তার ভুল অনুধাবন করতে সাহায্য করতে হবে। এমনভাবে কথা বলতে হবে, যাতে তার মধ্যে অনুশোচনাবোধ জাগ্রত হয়।

চৌদ্দ. সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন। জোরপূর্বক সন্তানের উপর কিছু আরোপ না করে কাজের প্রতি তাকে আগ্রহী করে তুলতে সাহায্য করুন। সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলুন। তাকে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজে উপার্জন করতে শেখান। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কাজে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করুন। এগুলো তাদের কোমল মনের বিকাশ সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

পনের. সন্তানের জন্য আদর্শ হোন। সন্তান সবসময় তার মা-বাবাকে অনুসরণ করে। তাই তাদের সামনে ভালোকাজের উদাহরণ সৃষ্টি করুন। আপনি যদি চান আপনার সন্তান নামাজি হবে, তাহলে আপনার উচিত তাকে নিয়ে প্রতিদিন মসজিদে হাঁটতে যাওয়া। তাকে নামাজ-সচেতন করে তুলতে হলে আগে নিজেকে সেভাবে নামাজী বানাতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর পথ গ্রহণ করতে হবে। এখান থেকেই সে শিক্ষা গ্রহণ করবে।

ষোল. জীবন থেকে শিক্ষা নিতে অনুপ্রাণিত করুন। মানুষ তার নিজের জীবন থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা নেয়। তাই আপনার সন্তানকে জীবনমুখী শিক্ষা দিন। জীবনকে উপভোগ করতে শেখান। অনেক পাঠ সে জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেই শিখে যাবে, যখন সে নিজে সেই পরিবেশ মোকাবেলা করবে।

সতের. চারপাশে দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তুলুন। আপনি যদি আপনার সন্তানকে আদর্শবান হিসাবে গড়ে তুলতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনার পরিবেশকে দ্বীনি পরিবেশে রূপান্তরিত করুন। তাহলে ছোটবেলা থেকেই সে দ্বীন শিখবে। আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।

এখানে অভিভাবকের বিশেষ কয়েকটি গুণ উল্লেখ করা হলো আশা করি এগুলোর উপর যথাযথভাবে আমল করতে পারলে আমাদের আদরের সন্তান আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে, ইনশা-আল্লাহ। আল্লাহ তা’আলা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।