ফরযে আইন ইলম কতটুকু?

আমার পরিচয় কী?....

সর্বকালের সকল মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- আমি কে? কী আমার পরিচয়? কোথা থেকে আসলাম? কেন আসলাম? কী আমার কাজ? আমার গন্তব্য কোথায়? জীবনের লক্ষ্য কী? জীবনের মানে কী? মূলনীতি কী? সকল ধর্ম-দর্শনই এ সকল মৌলিক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইসলাম দিয়েছে সবচে সঠিক, সুন্দর, সার্থক ও প্রশান্তিকর উত্তর বা সমাধান। আর এই সমাধানই মানবতার চূড়ান্ত মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি। এই সমাধান প্রদানই হলো দ্বীন ও শরীয়তে ইসলামের কাজ।

দ্বীনের প্রথম বিষয় হলো- ঈমান।

আর ঈমান, আকীদা-বিশ্বাস হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঈমান সহীহ করা, ঈমান মজবুত করা, ঈমান খাঁটি করা, ঈমান নির্ভেজাল করা, ঈমানের বিষয়গুলো আয়ত্ব করা, এটা আমার-আপনার প্রথম দায়িত্ব। ঈমান হলো আলো, কুফর হলো অন্ধকার। ঈমান হলো সিরাতে মুস্তাকীম, সরলপথ। আর কুফর হলো গোমরাহী, বক্রপথ। ঈমান আর কুফর দুইটা একসাথে হবে না, একসাথে চলবে না, একসাথে থাকবে না। ঈমান থাকলে সেখানে কুফর আসতে পারবে না। ঈমানের সাথে কুফরের কোনো স্থান নেই। আমি মুসলমান, আবার কুফরী করব, এটা হবে না। কুফরী আসলে ঈমান ভেঙ্গে যাবে। শিরক আসলে ঈমান ভেঙ্গে যাবে। এই ঈমান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, খুবই জরুরী বিষয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ইবাদত-বন্দেগী/আমল করার জন্য। ইবাদত/আমলে পূর্বশর্ত হলো ঈমান। আর ঈমান না থাকলে কোনো নেক আমলই গ্রহণযোগ্য নয়।

ঈমানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়- ঈমান হলো, রসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার সবগুলোকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আস্থার ভিত্তিতে, তাদের সংবাদের উপর নির্ভর করে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা, মেনে নেওয়া, মৌখিকভাবে সাক্ষ্য প্রদান করা এবং যাবতীয় কুফর-শিরকের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা। আর ঈমানের দাবি অনুযায়ী আমল করা- এর নাম পরিপূর্ণ ঈমান। এখন ভাবনার বিষয় হলো, আমি যে ঈমান আনলাম, কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলাম, এটাতো একটা স্বীকারোক্তী, শপথবাক্য ও প্রতিশ্রুতিবাক্য। এই বাক্যের মাধ্যমে আমি কী কী বিষয়ে স্বীকারোক্তী দিলাম? কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিলাম? কিসের উপর শপথ নিলাম? এই ঈমানের দাবী কী? খোদ ঈমান আনার দ্বারা কোন কোন বিষয় আমার উপর সাব্যস্ত হয়ে যায়? এ জাতীয় বিষয়কে ঈমানের চাহিদা/দাবী বলে। 

ইলম অর্জন করা ঈমানের সবথেকে বড় দাবী....

আল্লাহ তাআলা যখন ফেরেশতাদের মানবজাতী সৃষ্টির কথা জানালেন, তখন ফেরেশতারা মন্তব্য করলেন- এরা পৃথিবীতে অনাচার করে বেড়াবে। পরস্পর খুনাখুনি-রাহাজানি করবে। আল্লাহ তাআলা তো জানেন, মানুষ হবে সৃষ্টির সেরা। মানুষের মর্যাদা হবে ফেরেশতাদের চাইতেও ঊর্ধ্বে। এরপর আল্লাহ তাআলা মানবজাতী সৃষ্টি করলেন। এবার ফেরেশতাদের সামনে এই জাতীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার পালা। আর আল্লাহ ফেরেশতাদের উপর মানবজাতীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য ইলমকে নির্বাচন করেছেন। যে কারণে আল্লাহ তাআলা মানবজাতীকে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম ইলম শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের নবী, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও সর্বপ্রথম ইলম অর্জন সম্পর্কে আদেশ দিয়েছেন। আর কুরআন ও হাদিসের ইলম-ই নবীদের রেখে যাওয়া মিরাস। ইলম থেকেই দ্বীন ও ঈমানের সূচনা। ইলমের উপরই দ্বীনের ভিত্তি। ইলম আর দ্বীন একে অপর থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। দ্বীনকে ইলম থেকে, ইলমকে দ্বীন থেকে আলাদা করা সম্ভব না। ইসলামের অবতরণ শুরু হয়েছে ‘ইকরা’ থেকে ‘কলম’ থেকে। একজন মানুষ ঈমান আনবে, দ্বীনদার হবে, কিন্তু ইলম শিখবে না, এটা হতেই পারে না। মনে রাখবেন, যার ইলম যতটুকু তার দ্বীনদারিও ততটুকু। সুতরাং ঈমান আনা যেমন ফরয, ইলম শিখাও ফরয। আর এই ইলম অর্জন করা ঈমানের সবথেকে বড় চাহিদা/দাবী। আমরা আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁরই ইবাদাত করার জন্য। তাঁর হুকুম মোতাবেক জীবনযাপন করার জন্য। আল্লাহর হুকুম মেনে জীবন পার করাই আমাদের দায়িত্ব। আমি ইলম ছাড়া জানবো কিভাবে কোনটা আল্লাহর হুকুম কোনটা আল্লাহর হুকুম নয়? কোনটা ইবাদত আর কোনটা ইবাদত নয়? কাকে ভালোবাসবো, কাকে শ্রদ্ধা করব, কাকে স্নেহ করব, কখন কাকে দয়া করব আর কাকে শত্রু জ্ঞান করব? কাকে বাহবা দিব আর কাকে তিরস্কার করব? কাকে কাছে টানবো আর কার থেকে দূরে সরব? কোনটা ইনসাফ আর কোনটা জুলুম কিভাবে নির্ণয় করব? সব তো ইলমে দ্বীনের উপর নির্ভরশীল। দ্বীনি ইলম না থাকলে তো আমি পাক-নাপাক, হালাল-হারাম সব গুলিয়ে ফেলব! কুফর-শিরক এক করে ফেলব।

তাই আল্লাহ তাআলা বলেন, অতএব, এই ইলম অর্জন কর যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মাবুদ হওয়ার যোগ্য নয়। [সূরা মুহাম্মাদ-১৯]

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর দ্বীনি ইলম অন্বেষণ করা ফরয। [সুনানে ইবনে মাজাহ-২২৪]

এখানে কত কথা নিহিত আছে, তা কিভাবে বোঝাবো। শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, সত্তাগত গুণাবলী, কর্মবৈশিষ্ট্য ইত্যাদির উপর বহু কিতাব লেখা হয়েছে। এরপর আছে ফেরেশতার প্রতি ঈমান, আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান, নবী-রসূলদের প্রতি ঈমান, আখিরাতে বিশ্বাস, কিয়ামতে বিশ্বাস, তাকদীরে বিশ্বাস ইত্যাদির বিভিন্ন দিক। এগুলো উসূলে ঈমান। উম্মতের বড় বড় প্রজ্ঞাবান আলেমগণ কতশত কিতাব যে লিখেছেন তার ইয়াত্তা নেই। আমরা তা পড়বো কোথায়, দেখতেও যেন প্রস্তুত নই সে সমস্ত সোনালী কিতাব। অথচ আল্লাহ তাআলা হুকুম করেছেন, এই ইলম অর্জন করো যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মাবুদ হওয়ার যোগ্য নয়।

ফরযে আইন ইলম কতটুকু?....

কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনি ইলম শিখতে হবে, শেখাতে হবে। এটা ঈমানী ফরয। এই ফরযের দুটি স্তর রয়েছে,

এক. ফরযে আইন স্তর: ফরযে আইন হলো, প্রয়োজনীয় যতটুকু ইলম হলে আমি দ্বীনি জীবন-যাপন করতে পারবো, ইসলামী জিন্দেগী গঠন করতে পারবো, এতটুকু দ্বীনে ইলম ফরযে আইন। যতটুকু ইলম শিখা না হলে পদে পদে ঈমান বিপন্ন হবে, ইবাদত-বন্দেগী বিনষ্ট হবে, সামাজিক সহাবস্থান সমস্যায় জর্জরিত হবে, পরস্পর লেনদেনে পদস্খলন ঘটবে, ততটুকু দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরযে আইন।

দুই. ফরযে কিফায়াহ স্তর: ফরযে কিফায়াহ হলো, ইসলামী ইলমের বিশেষজ্ঞ হওয়া, পণ্ডিত হওয়া, শাস্ত্রজ্ঞ হওয়া। মানুষের যেকোনো সমস্যার দলিল-ভিত্তিক শরঈ সমাধান দিতে পারে এমন পারদর্শী আলেম হওয়া,  এটা ফরযে কিফায়াহ। পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশেষজ্ঞ আলেম তৈরি হওয়া ফরযে কিফায়াহ। মুসলিম জনসাধারণ ও সরকারের উপর এমন আলেম তৈরীর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ফরয।

ফরযে আইন ইলম কতটুকু? ফরযে আইন পরিমাণ যে দ্বীনি ইলম শিক্ষা, এর পরিধি কতটুকু? ফরযে আইন শিক্ষার তালিকা কতটুকু? আমাদের কি ফরযে আইন পরিমাণ ইলম আছে? আমি মুসলমান হিসেবে যতটুকু দ্বীনি ইলম শিখা আমার জন্য ফরযে আইন, ততটুকু দ্বীনি ইলম কি আমি অর্জন করেছি? এটা নিয়ে কি ভেবেছি? ফরযে আইন ইলমের তালিকা কতটুকু, এটা কি আমি জানি? ফরযে আইনের একটা অংশ তৎক্ষণাৎ শিখে নেওয়া ফরয। যখন যে কাজ করবে, তখন তার বিধান শিখে নেওয়া ফরয। হজ্জে যাচ্ছেন, হজ্জের মাসআলা এখনি শিখে নিতে হবে। বিয়ে করছেন, বিয়ে ও তালাকের মাসআলা এক্ষুণি শিখে নিতে হবে। ফরযে আইনের আরেকটা অংশ পর্যায়ক্রমে শিখতে হয়, শিখার ধারা অব্যাহত রেখে শিখতে হয়। যেমন, কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত সহীহ করা। একদিনে আর এক বসায় তৎক্ষণাৎ তো তিলাওয়াত সহীহ হয়ে যাবে না। ফরযে আইন পরিমাণ তিলাওয়াত শিখার চেষ্টা জারি রাখবে আর যা পারে তাই দিয়ে নামায পড়তে থাকবে। হুকুকুল্লাহ ও হুকুকুল ইবাদের যে সকল মাসআলা ও ইলম পর্যায়ক্রমে শিখে নিতে হবে, সহজে বুঝার জন্য নিচে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ফরযে আইনের প্রথম ইলম: ঈমান-আকিদা.....

একজন মানুষের প্রথম দায়িত্ব হলো, নিজের ঈমানকে ঠিক করা, দুরস্ত করা, পরিশুদ্ধ করা। পরিশুদ্ধ ঈমান গ্রহণ করা এবং ঈমান বিধ্বংসী বিষয় থেকে বেচেঁ থাকা প্রত্যেকটা মানুষের উপর ফরযে আইন। পরিশুদ্ধ ঈমান গ্রহণ ও ঈমান বিধ্বংসী বা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বেচেঁ থাকার জন্য সে সম্পর্কে ইলম অর্জন করা ফরযে আইন। ঈমানের প্রয়োজনীয় ইলম না থাকার কারণে বর্তমানে বহু মুসলমান বেঈমান হয়ে যাচ্ছে তাদের অজান্তেই। অনেক মুসলমান জানেই না ঈমান কাকে বলে, ফলে সে নামায পড়ছে, যিকির করছে, রোযা রাখছে, হজ্বও করছে কিন্তু সে যে ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছে টেরই পাচ্ছে না। বর্তমানে যেই পরিমাণ মুসলমান উযু ভঙ্গের কারণসমূহ জানে তার সিংহভাগই ঈমান ভঙ্গের কারণ কি তা জানে না। যার ফলে উযু ভেঙ্গে গেলে মুসলমান টের পাচ্ছে ঠিকই! কিন্তু ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছে তা টেরই পাচ্ছে না। উযু ভঙ্গের কারণ থেকে যেকোনো একটি কারণ প্রকাশ পেলেই যেমন পূর্ণ উযু ভেঙ্গে যায়, তেমনই ঈমান ভঙ্গের কারণ থেকে যেকোনো একটি কারণ প্রকাশ পেলেই ঈমান নষ্ট হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত নিজের ঈমানকে পরিশুদ্ধ রাখা, খাটি ও নির্ভেজাল রাখা, সর্বদা ঈমানের উপর থাকা ও ঈমানসহ কবরে পৌছার জন্য সর্বাত্তক চেষ্টা চালাতে হবে। আর এই চেষ্টায় সফল হতে ঈমানের প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে হবে। আমাকে অবশ্যই জানতে হবে, পরিশুদ্ধ ঈমান গ্রহণের পদ্ধতি। ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো কী কী? কোন কোন বিষয়ের উপর কীভাবে ঈমান রাখতে হবে? ঈমান ভঙ্গের কারণ কী কী? ঈমান বিধ্বংসী কথা, কাজ ও সমর্থন ইত্যাদি বিষয়েও জানতে হবে, ইলম অর্জন করতে হবে। আর এই ইলমই হলো, ফরযে আইন পরিমাণ ইলমের প্রথম ইলম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই পরিমাণ ইলম অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন। 

ফরযে আইনের দ্বিতীয় ইলম: ইবাদাত.....

ঈমান আনার পর মানুষের প্রথম কাজ হলো, ইবাদাত/আমল করা। ইবাদত কাকে বলে? ইবাদতের পরিচয় কি? কোন কোন ইবাদত ফরয এবং কিভাবে আদায় করতে হবে, এটা জানাও ফরয। যে সকল ইবাদাত ফরযে আইন, সে সকল ইবাদাত সঠিকভাবে আদায় করার জন্য যতটুকু ইলম প্রয়োজন, ততটুকু ইলম অর্জন করাও ফরযে আইন। ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাঁচওয়াক্ত নামায। কোনো অমুসলিম মুসলমান হলে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নামায শিক্ষা দিতেন। একজন মুসলমানের সন্তান যখন বালেগ হয়, তখন তার উপর প্রথম ফরয হয় নামায। নামায যেহেতু আমার উপর ফরযে আইন, তাই নামায সঠিকভাবে আদায়ের জন্য নামাযের বিধি-বিধান জানাও আমার উপর ফরযে আইন। নামায পড়ার আগে পবিত্রতা শর্ত, সুতরাং পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম উযু, গোসল ও তায়াম্মুমের মাসাইল জানাও ফরয। মহিলাদের জন্য হায়েয-নেফাসের মাসাইল জানাও ফরয। এমনিভাবে রমাযান মাস আসলে রোযার মাসাইল, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে যাকাতের মাসাইল, হজ্জ ফরয হলে হজ্জের মাসাইল, বিয়ে-শাদির প্রয়োজন হলে বিবাহ ও তালাকের মাসাইল জানাও ফরয। মনে রাখবেন! যে সকল ইবাদাত আমাদের উপর ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুআক্কাদাহ তার মাসআলা-মাসাইল শিক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের উপর ফরয। এখন চিন্তা করুন, ইবাদাত সংক্রান্ত মাসআলা-মাসাইল আমার কতটুকু জানা? ফরযে আইন পরিমাণ ইলম আমার আছে কি?

ফরযে আইনের তৃতীয় ইলম: মুআমালাত.....

দ্বীন ইসলামের প্রথম বিষয় হলো, ঈমান-আকিদা। দ্বিতীয় বিষয়- ইবাদাত। তৃতীয় বিষয় মুআমালাত, লেনদেন, কায়কারবার। আপনি ব্যবসা করবেন, এটা একটা মুআমালা। ব্যবসা করলে ব্যবসার মাসআলা-মাসাইল, হালাল-হারাম জানা ফরয। হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেছেন, মানুষ দ্বীন মনে করে শুধু ইবাদতকে। নামায পড়ে, ব্যস দ্বীনদার। কিন্তু তার লেনদেন ঠিক নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য শরীয়তসম্মত না। তার চাকুরী শরীয়তসম্মত না। তার উপার্জন, ইজারা শরীয়তসম্মত না। এ সংক্রান্ত দ্বীনের মাসআলা-মাসাইল তার জানা নেই, কিন্তু সে নিজেকে মনে করে দ্বীনদার। অথচ পরিপূর্ণ দ্বীনদার হতে হলে লেনদেন, কায়কারবার শরীয়তের বিধানমতো হতে হবে। আমি নামাযও পড়লাম, আবার সুদও খেলাম, ঘুষও নিলাম, নাজায়েয লেনদেন করলাম, জুলুম করে/অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করলাম, তাহলে আমি দ্বীনদারের দাবি করলেও দ্বীনদার না। অনেক মানুষ লেনদেন-মুআমালাকে দ্বীনের অংশই মনে করে না। নিজেকে মনে করে স্বাধীন, তাই যেভাবে মন চায় সেভাবে উপার্জন করবে। দ্বীন তো শুধু মসজিদে, নামায পড়লে দ্বীন হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে, চাকুরী, মিল-ফ্যাক্টরি সেখানে দ্বীনের কোনো বিধি-বিধান নেই। অথচ এগুলোও দ্বীনের এক বড় অংশ, এখানেও দ্বীনের অনেক বিধি-বিধান রয়েছে, এটা জানে কয়জনে?

বর্তমান আধুনিক যুগে লেনদেনের অসংখ্য নতুন সুরত বের হয়েছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের কারণে নতুন নতুন অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য আমরা করছি। কিন্তু আমি কি খবর নিয়েছি, আমার ব্যবসাটা জায়েয হচ্ছে কিনা? এটা শরীয়তসম্মত কিনা? এতে গুনাহ হচ্ছে কিনা? কোনো খবর নেই। আমি নামাযও পড়ছি আবার অবৈধভাবে উপার্জনও করছি। তাহলে আমি কি নিজেকে প্রকৃত দ্বীনদার বলে দাবি করতে পারি?

ফরযে আইনের চতুর্থ ইলম: মুআশারাত.....

দ্বীন ইসলামের ফরযে আইন ইলমের চতুর্থ বিষয় হলো, মুআশারাত। মুআশারা হলো সহাবস্থানের বিধি-বিধান ও নীতিমালা। সমাজ-জীবনের নীতিমালা। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবিজ্ঞানের ইসলামী নীতিমালা না জানলে আমি দ্বীনদার হতে পারব না। হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. আফসোস করে বলেছেন- যারা নিজেদেরকে দ্বীনদার মনে করে, আদাবুল মুআশারা ও সামাজিক জীবনের নীতিমালাকে তারাও দ্বীনের অংশ মনে করে না। অথচ সেখানেও দ্বীনের অনেক জরুরী বিধি-বিধান রয়েছে। কিছু উদাহরণ দিচ্ছি, মুআশারার যিন্দেগী শুরু হয় পরিবার থেকে। পরিবারের মধ্যে প্রথম হলো, বাবা-মা, সন্তান-সন্ততি। এটা পরিবারের শুরু। এখন বাবা-মা কি জানেন সন্তানের কী হক? সন্তান হিসেবে আমি কি জানি বাবা-মা-র কী হক? এটা জানা জরুরী। আপনার দাম্পত্য জীবন শুরু হয়, বিয়ের মাধ্যমে। কিন্তু বিয়ে করার আগে বিয়ের মাসআলা-মাসাইল জানা ফরয। বিয়ের জন্য বর-কনে প্রস্তুত, কেনাকাটা সব ঠিক, গয়নাপাতি সব ঠিক, সব কিছু প্রস্তুত। সে কি জানে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের হকগুলো কী কী? গোসল ফরয হয় কখন? গোসল ফরয হলে কিভাবে গোসল করতে হয়? না জানলে প্রস্তুত হলাম কিভাবে? এটা কি প্রস্তুতি হলো? এটাতো জাহান্নামে ঝাঁপ দেওয়া হলো। সাঁতার না জেনে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার মতো। তালাক কখন দেওয়া যায়, কখন দেওয়া যায় না? কিভাবে তালাক দিতে হয়? কয় তালাক দিতে হয়? এগুলো কি প্রয়োজন না? এখন এমন অবস্থা যে, অনেকে বলতেও পারবে না তাদের তালাক হয়ে গেছে। এভাবে সংসার করছে, হারাম কাজ করছে। হায় হায়! অথচ নামাযও পড়ে। পরিবার সংক্রান্ত অনেক মাসআলা-মাসাইল রয়েছে, যা আমাদের জানা জরুরী।

এমনিভাবে আত্মীয়-স্বজনের হক আছে। ভাই বোনের হক আছে। প্রতিবেশীর হক আছে।  ওয়াজিব হক আছে, মুস্তাহাব হক আছে, তো ওয়াজিব হকগুলো তো জানতেই হবে। আমরা কি জানি সে হকগুলো কী কী?  একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক আছে। এমনকি একজন মানুষের উপর ওপর মানুষের হক আছে। যাকে মানবাধিকার বলে। মানবাধিকার মানবাধিকার বলে চিৎকার করে। মানবাধিকারের ধারণা ইসলামই সর্বপ্রথম দিয়েছে। এর আগে মানবাধিকার কাকে বলে কেউ জানতো না। মানবাধিকার কাকে বলে? একটা মানুষের কী অধিকার? এটা ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে। শুধু মানবাধিকার না জীবেরও অধিকার আছে। আমি আপনি যে গরু-ছাগল-মুরগি পালি, তারও অধিকার আছে। এমনকি বৃক্ষলতারও অধিকার আছে! এই হুকুকের ইলম শরীয়তে ইসলামের অনেক বড় অধ্যায়। দ্বীনের এই অধ্যায়ের প্রতি আমাদের মতো দ্বীনদার মানুষও বেখবর। তাই দ্বীনদার হতে হলে হুকুমের ইলম হাসিল করতে হবে।

এমনিভাবে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ, এ বিষয়ে জানাও জরুরী। কখন সৎ কাজে আদেশ করা ওয়াজিব আর কখন অসৎ কাজে নিষেধ করা ওয়াজিব? কার জন্য কখন ওয়াজিব? কখন হাত দিয়ে বাধা দেবে? কখন শুধু মুখে বলবে আর কখনইবা অন্তরে অন্তরে শুধু ঘৃণা করে ক্ষান্ত হবে? এই বিধি-বিধানগুলোও জানা ফরয।

ফরযে আইনের পঞ্চম ইলম: আখলাক.....

দ্বীন ইসলামের ফরযে আইন ইলমের পঞ্চম বিষয় হলো, আখলাক। ইসলামের চারিত্রিক বিধান। নৈতিক শিক্ষা। মনোনৈতিক বিধান। আত্মিকজগতের বিধান। সঠিক চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতা বিনির্মানের জ্ঞান। মানুষের ভেতরে কিছু চরিত্র আছে যা খারাপ। আল্লাহ তাআলা মানুষের ভেতরে এগুলো রেখেছেন পরীক্ষার জন্য। এটার হিকমত আছে। যেমন, অহংকার করা, হিংসা পোষণ করা, কু-ধারণা করা, গীবত করা, কৃপণতা করা, লোভ-লালসা করা, রিয়া, চোগলখোরী করা, কু-দৃষ্টি, অবৈধপ্রেম, গান-বাদ্য, নেশা, মিথ্যা, গালি-গালাজ ও অশ্লীলতা ইত্যাদি এগুলো খারাপ চরিত্র। এই খারাপ চরিত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা ফরয। এই খারাপ চরিত্রগুলোর কারণে সমাজে অসংখ্য খুন-খারাবী হয়। অসংখ্য ফিতনা-ফাসাদ হয়। সমাজে, দাম্পত্য জীবনে, পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, রাষ্ট্রে অশান্তি সৃষ্টি হয়। 

কিছু চরিত্র আছে ভালো, উত্তম চরিত্র, উত্তম গুণাবলী, যেগুলো আল্লাহ ও আল্লাহর রসুল অর্জন করার জন্য বলেছেন। সেগুলো অর্জন করা এক পর্যায়ে ওয়াজিব। যেমন, কৃতজ্ঞতাবোধ, ইখলাস, বিনয়, তাকওয়া, সবর, সহনশীলতা, দানশীলতা, রুচিশীলতা, তাওয়াক্কুল, শোকর, আল্লাহর মুহাব্বত, খুশু-খুযু, গায়রত, কানাআত, সততা, আমানতদারী, অল্পেতুষ্টি, ত্যাগ, লজ্জাশীলতা, মমতা-কোমলতা, শ্রদ্ধা-শৃঙ্খলা-সমঝোতা, স্নেহ-সৌহার্দ-প্রীতিবোধ, ক্ষমা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইনসাফ ও অঙ্গীকার রক্ষা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলী নিজের মধ্যে বিকশিত করা, প্রত্যেকের মাঝে সুন্দর-অসুন্দরের গভীরতম অনুভব জাগ্রত করা ইত্যাদি। এগুলো উত্তম গুণাবলী, উত্তম চরিত্র। যা প্রত্যেকের অর্জন করা জরুরী। চরিত্রহীন যে, তার ঈমান কচুপাতার পানির মতো। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম তো কোনো কোনো চারিত্রিক ত্রুটিকে ‘বেঈমানী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাহলে বুঝুন, আখলাকের ইলম কত জরুরী। আদব-কায়দার ইলম কত প্রয়োজনীয়।

এ ছাড়াও কিছু প্রয়োজনীয় ইলম.....

ঈমান-আকিদা, ইবাদাত, মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাকের ইলম, এই পাঁচটি ইলমের সমন্বয়ে দ্বীন। এই পুরোটার নাম দ্বীন। আরো সহজে বলা যায় যে, এই মুহুর্তে আল্লাহ তাআলা আমার কাছে কী চান? তা জানা ও মানা, এর নাম দ্বীন। ফরযে আইন ইলমের ভিতর হালাল-হারাম, সুন্নাত-বিদআত, হক-বাতিল, কবীরা-সগীরা, ইতিহাস-সীরাত ইত্যাদির কিছু ইলমও শামিল। এবার বুঝতে পেরেছেন, শুধু ফরযে আইনের ইলম কত বিস্তৃত? এরও বাইরে শরঈ ইলমের কত বিশাল ময়দান রয়ে গেছে। যাই হোক, আমরা তাহলে চিন্তা করে দেখি, ফরযে আইনের ইলম আমার কতটুকু? সেমতে আমি কতটুকু দ্বীনদার?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইলম, অগ্রাধিকার দেওয়ার ইলম। যেমন, শরীয়তের বিধান অনেক, একই সাথে আমার সামনে বাহ্যত একাধিক বিধান চলে আসতে পারে। কখন মূলত কোনটি প্রযোজ্য এবং অগ্রাধিকারযোগ্য তা জানতে হবে। পিতা-মাতা আমাকে দ্বীনি কাজে পাঠিয়ে দিয়ে সবর করবেন নাকি নিজেদের কাছে রেখে সেবা গ্রহণ করবেন? আমি আজই চিল্লায় বের হব নাকি স্ত্রীকে ডাক্তার দেখিয়ে দুদিন পরে যাবো? আগে বিয়ে করব না হজ্জে যাবো? ব্যবসা কোনটা ধরব? চাকরি কোনটা ছাড়ব? মামলা করলে ভালো হবে না সবর করলে ভালো? আমি জিহাদে যাবো না অসুস্থ পিতা-মাতার সেবা করব? স্থান-কাল-পাত্র ভেদে উপযুক্ত বিধান চয়ন করা দ্বীনের নির্যাস। মানুষের দ্বীনি ও দুনিয়াবী জীবন সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য এই ইলমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এই ইলম আসে সব শেষে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ফরযে আইন পরিমাণ ইলম শেখার ও বোঝার তাওফীক দান করুন, আমীন।

ফরযে আইন পরিমাণ ইলম শিখব কিভাবে?.....

ফরযে আইন পরিমাণ ইলম আমাকে শিখতেই হবে। যদি ইসলামী সরকার থাকত, তাহলে ইসলামী সরকারের মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় জাগতিক শিক্ষার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় দ্বীনি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হতো। যাতে প্রত্যেক মুসলমান প্রয়োজন পরিমাণ দ্বীন শিখতে পারে। এতটুকু সিলেবাস তারা বানাত। কিন্তু এখন এতটুকু সিলেবাস নেই। শিক্ষাকে বিশ্বায়নের অনুগামী করা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষ করা হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাক্রম দ্বীনি শিক্ষা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় দ্বীনি ইলম কোত্থেকে শিখব? আমরা বয়স্ক হওয়ার পরেও তিন পদ্ধতিতে ফরযে আইন পরিমাণ ইলম শিখতে পারি। 

এক. বয়স্ক/নৈশ মাদরাসা। কোনো বয়স্ক মাদরাসায় ভর্তি হয়ে, কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত সহীহ করার পাশাপাশি ফরযে আইন পরিমাণ ইলমে দ্বীন শিখতে পারব।

দুই. আলেমের সোহবত। সরাসরি কোনো হক্কানী, মুহাক্কিক আলেমের তত্ত্বাবধানে দ্বীনের প্রয়োজনীয় ইলম শিখবেন। যখনই সমস্যা আসে তখনই জিজ্ঞাসা করে করে আমল করবেন এবং তিনার পরামর্শক্রমে দ্বীনি বই/কিতাব পাঠ করে করে দ্বীন শিখবেন। মনে রাখবেন! আলেমের দিকনির্দেশনা ছাড়া কোনো বই/কিতাব পড়বেন না।

তিন. তাবলীগ। উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে দাওয়াত ও তাবলীগে গিয়ে প্রয়োজন অনুপাতে উক্ত আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করে করে জেনে নিবেন ও আমল করবেন।